আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারি, নবাব সিরাজুদ্দৌলার সৈন্য বাহিনীর বৃহদাংশ, নবাব পরিবারের একাংশ, কোম্পানির আস্থাভাজন বাংলার দুশমন রাজা দূর্লব রাম, রাজা রাজবল্লভ, রাজা মানিক চাঁদ, মাহতাবচাঁদ জগৎশেঠ প্রমুখ সুদখোর মহাজন এবং স্বার্থপর সেনাপতি এয়ার লতিফ খান প্রমুখকে নিয়ে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী রবার্ট ক্লাইভ, বাংলার মসনদ ও নবাবিকে নীলামে তুলেন। রবার্ট ক্লাইভ ও বেঈমান মীরজাফরের ক্ষমতা ভাগাভাগি ও নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে ক্ষমতা চ্যুতির লক্ষ্যে মাহাতাব চাঁদ জগৎ শেঠ এর বাড়িতে গোপন বৈঠক হয়। বৈঠকে রাজা রাজবল্লভ, উর্মিচাঁদ, এয়ার লতিফ খান, সিপাহসালার মীরজাফর আলী এবংইংরেজ প্রতিনিধি মিঃ ওয়াট উপস্থিত ছিলেন। আলোচনাক্রমে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় ইংরেজরা সৈন্য দিয়ে বিদ্রোহীগণকে সাহায্য করবেন, নবাব সিরাজের পতন ঘটিয়ে সিপাহ সালার মীরজাফর আলীকে বাংলার রাজসিংহাসনে বসানো হবে। এই মর্মে উভয় পক্ষে লিখিত চুক্তি সাক্ষরিত হয়। বিশিষ্ট গবেষক বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভস এর পদস্থ কর্মকর্তা মীর ফজলে আহমদ চৌধুরী তার গবেষণা গ্রন্থ দলিলপত্রে পলাশীর যুদ্ধ গ্রন্থে “জাফর আলী খাঁন ও ইংরেজদের মধ্যে চুক্তিপত্র ” শিরোনামের অধ্যায়ে বলেন -মীরজাফর আলী খাঁন এর সংগে ইংরেজদের মোট তিনটি চুক্তি হয়। প্রথমটি গোপনে পলাশীর যুদ্ধের পূর্বে এবং অন্য দুটি সিরাজুদ্দৌলার পতনের পর ইংরেজরা মীরজাফরকে নবাব ঘোষণা করার পর। ১০ই মে গোপন চুক্তিটি ১৫ ই রমজান ১১৭০ হিজরি সনে সম্পাদিত হয়ে ছিল। মূলচুক্তি সমূহ সম্পাদিত হয়েছিল ফার্সী ভাষায়। তখন সর্বভারতীয় রাস্ট্রভাষা ছিল ফার্সী। ফার্সীতে রচিত চুক্তিনামা ইংরেজ ও বাংলায় অনুদিত হয়।

মীরজাফর আলী খাঁন এর সংগে সন্ধিঃ ১৭৫৭সাল। আমি আল্লাহ ও আল্লাহর নবীর নামে শপথ করছি যে, যতক্ষণ জীবন আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এই সন্ধির শর্তাবলী মেনে চলব।(এই অংশটুকু মীর জাফর আলী খাঁন নিজ হাতে লিখেন)। মীর মোহাম্মদ জাফর খান বাহাদুর বাদশা আলমগীরের সেবক। এই সন্ধিটি এডমিরাল এবং কর্ণেল ক্লাইভ( সাবুদ জং বাহাদুর) গভর্ণর ড্রেক এবং মিঃ ওয়াট এর সংগে সম্পাদিত।

আর্টিকেল-১
যে সকল শর্তসমূহ, শান্তিকালীন সময়ে নবাব সিরাজুদ্দৌলা মনসুর উলমূলক শাহ কুলি খান বাহাদুর, হায়বাত জং এর সময়ে সম্পাদিত হয়েছিল, আমি সেগুলি মানতে সম্মত আছি।

আর্টিকেল-২
ইন্ডিয়ান অথবা ইউরোপীয়ান যেই হোন, যারা ইংরেজের শত্রু তারা আমারও শত্রু।

আর্টিকেল-৩
বাংলা বিহার এবং উড়িষ্যায় ফরাসিদের যে সমস্ত ফ্যাক্টরি ও অন্যান্য স্থাপনাসমূহ রয়েছে সেগুলি ইংরেজদের দখলে যাবে। আমি কখনোই তাদেরকে উক্ত তিনটি স্থানে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেব না।

আর্টিকেল-৪
নবাব কতৃর্ক কলকাতা দখল ও লুন্ঠনের ফলে ইংলিশ কোম্পানির যে ক্ষতি হয়েছে এবং সৈন্যদলের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে, অর্থ ব্যয় হয়েছে তা বিবেচনা করে আমি এক কোটি টাকা প্রদান করবো।

আর্টিকেল-৫
কলকাতা বসবাসকারী ইংরেজদের যে সকল মালামাল লুন্ঠন হয়েছে, সেজন্য আমি ৫০ লক্ষ টাকা দিতে সম্মত হলাম।

আর্টিকেল-৬
কলকাতায় বসবাসকারী সুধীজন, মুসলমান এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ যাদের সম্পদ লুন্ঠন হয়েছে তাদের জন্য ২০ লক্ষ টাকা প্রদান করা হবে।

আর্টিকেল-৭
কলকাতা বসবাসকারী আরমেনিয়ান যাদের সম্পদ লুন্ঠন হয়েছে, সেজন্য আমি ৭ লক্ষ টাকা প্রদান করবো। বরাদ্দকৃত অর্থ এডমিরাল এবং কর্ণেল ক্লাইভ কতৃর্ক দেশীয়, ইংরেজ, সকল সুধীজন, এবং মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করবেন এবং বাকি অর্থ কাউন্সিল কতৃর্ক যাকে উপযুক্ত মনে করবেন তাকে বন্টন করবেন।

আর্টিকেল-৮
কলকাতার চারদিকে যে খাদ আছে সেগুলি বেশ কয়েকজন জমিদারের দখলে, আমি ইংরেজ কোম্পানিকে খাদ ব্যতীত ছয়শত গজ জমি প্রদান করব।

আর্টিকেল-৯
কলকাতার দক্ষিণ দিকে কলপি পর্যন্ত যে পরিমাণ ভূমি আছে সেগুলি ইংরেজ কোম্পানি, জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হবে এবং সেখানকার সকল কর্মকর্তা তাদের অধীনস্থ হবে। অন্যান্য জমিদারের মত তারাও (অর্থাৎ কোম্পানি) একইভাবে রাজস্ব প্রদান করবে।

আর্টিকেল-১০
গংঙা নদীর নিকটবর্তী হুগলিতে আমি কোন দূর্গ নির্মাণ করব না।

আর্টিকেল-১১
প্রদেশ ৩টিতে সরকার প্রতিস্টা করার সংগে সংগেই যথাসম্ভব শীঘ্র আমি উপরোক্ত অর্থ বিশ্বস্ততার সাথে প্রদান করব। ১৫ই রমজান ৪র্থ বর্ষ রাজস্বকাল। (এই ১১টি অনুচ্ছেদ সম্পাদিত হওয়ার পর আরোও একটি অতিরিক্ত শর্ত সংযুক্ত করা হয়)

আর্টিকেল-১২

এই অনুচ্ছেদ বা আর্টিকেলগুলি এই শর্তে গৃহিত হল যে, মীর জাফর আলী খাঁন বাহাদুর উপরোক্ত শর্তাবলী শপথ করে নিশ্চিত এবং বাস্তবায়িত করবেন। যা সম্মানিত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ঈশ্বরকে স্বাক্ষি রেখে ঘোষণা করছে যে, আমরাও আমাদের শক্তিদ্বারা মীরজাফর খান বাহাদুরকে বাংলা বিহার ঊড়িষ্যা প্রদেশের সুবেদার পদে অধিস্টিত হওয়ার জন্য সাহায্য করব এবং তার সকল প্রকার শত্রুদের বিরুদ্ধে যখনই তিনি সাহায্যের জন্য আবেদন করবেন, তখনই সর্বাত্নক সাহায্য করব। উপরোক্ত অনুচ্ছেদ বা শর্তাবলী তখনই কার্যকর হবে যখন তিনি নবাব হবেন।

দেশ প্রেমিক অনেকেই আশংকা করেন আমাদের প্রিয় জন্মভূমি, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এ ধরনের কোন গোপন চুক্তির নিকট যাতে জিম্মি হয়ে না পড়ে সেদিকে সজাগ থাকা আজকের পলাশী দিবসের অন্যতম শিক্ষা।

লেখক- ডাঃ মুহাম্মদ ওবায়দুর রব তারেক
ডিভিএম-সিকৃবি,এম এস-সিকৃবি