রুমেল এম এস পীরঃ ‘কীর্তিমানের মৃত্যু নাই’- কথাটা ছোটবেলা অনেক শুনেছি। বাংলাদেশের এমন এক কীর্তিমান ছিলেন প্রাক্তণ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান। আজ তাঁর মৃত্যুদিবস।
২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যু হয় এই মানুষটির।
যদিও তিনি স্বশরীরে আমাদের মাঝে নাই, তবু তাঁর কর্মের কারণে কোটি কোটি দেশবাসীর হৃদয়ে এম. সাইফুর রহমান বেঁচে রইবেন অনন্তকাল।
জন্ম ও পড়ালেখা-
তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালে, সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায়। ১৯৪৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক । ১৯৫১ সালে সিলেট এম.সি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করেন এম. সাইফুর রহমান।
এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.কম পাশ করে ১৯৫৪ সালে তিনি লন্ডনে পড়তে যান। এবং চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হিসেবে সনদপ্রাপ্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন।
পুরোদস্তুর চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশে ‘ রহমান এন্ড হক’ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। যা ঐ সময়ে দেশের সেরা চার্টার্ড একাউন্টস ফার্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
রাজনীতিতে প্রবেশ-
বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমন্ত্রনে এম. সাইফুর রহমান ১৯৭৮ সালে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন । ১৯৭৯ সালে বিএনপি সরকারের শাসনামলে প্রথমবার দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এছাড়া বিএনপি’র ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ সরকারেও তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মাঝে ২০০১-২০০৬ সময়ে অর্থ মন্ত্রনালয়ের পাশাপাশি তিনি সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন।
বাংলাদেশের রেকর্ড সংখ্যক ১২ টি বাজেট প্রনয়ণ করেছেন এম. সাইফুর রহমান। বাংলাদেশের চরম মর্যাদাপূর্ণ আসন সিলেট-১ থেকে এবং মৌলভীবাজার-৩ থেকে তিনি বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
অনেকের মতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী ছিলেন এম. সাইফুর রহমান। তাঁর দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনা দেশের অর্থনীতিকে করেছে সমৃদ্ধ।
জেনারেল এরশাদের দীর্ঘ সেনা শাসনের পর সংসদীয় গনতন্ত্রের শুরুতে ১৯৯১ সালে যখন তিনি অর্থমন্ত্রী হোন তখন দেশের আর্থিক অবস্থা ছিলো নাজুক।
কিন্তু এম. সাইফুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হওয়া শুরু হয়। তাঁর নেওয়া কিছু পদক্ষেপ ছিলো যুগান্তকারী।
তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর প্রবল আপত্তির মুখেও তিনি মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আইন চালু করেন। এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই ভ্যাট ভীষণ গুরুত্বপূর্ন।
তিনি দেশের জন্য আধুনিক ইনকাম ট্যাক্স আইন চালু করেন। এছাড়াও বাংলাদেশকে বৈশ্বিক মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সংযুক্ত করার সিংহভাগ কৃতিত্বের দাবীদার জনাব এম. সাইফুর রহমান।
তিনি অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতে শৃংখলা বজায় ছিলো। খেলাপি ঋণ কখনোই লাগামছাড়া হয়নি।
এর পাশাপাশি শেয়ার বাজারের প্রতি অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের ছিলো তীক্ষ নজর। তিনি জানতেন কি করে শেয়ার বাজারের লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারীর আস্থা অর্জন করতে হয়।
তার আমলে কখনোই শেয়ার বাজারে নূন্যতম বিপর্যয় হয়নি বরং সকলেই তখন লাভবান হতে পেরেছিলো।
সিলেটের প্রতি ভালবাসা-
সিলেটের প্রতি ছিলো তাঁর সীমাহীন টান। বৃহত্তর সিলেটে এমন কোনো জায়গা কিংবা এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে এম. সাইফুর রহমানের উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি।
সিলেটের অসংখ্য রাস্তাঘাট, ব্রীজ এবং মহাসড়ক স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রণয়ন ও সেগুলোতে দ্রুত অর্থায়ন করেছিলেন এম. সাইফুর রহমান।
বড় বড় এবং জন গুরুত্বপূর্ন অনেক স্থাপনা নির্মান ও সংস্কারও হয়েছিলো তাঁর আমলে।
সিলেটের শিক্ষার মান উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা ছিলো কিংবদন্তীতূল্য। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনে তাঁর অবদান সর্বজন স্বীকৃত।
তিনি মন্ত্রী হিসেবে সিলেটের যে উন্নয়ন করেছেন তা সকলের কাছে আজও দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
বাংলাদেশের খুব কম রাজনীতিবীদই দল-মতের উপরে উঠে সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা আদায় করতে পেরেছেন। এম. সাইফুর রহমান তেমনই একজন।
আজও বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলোচনায় তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
সিলেটের বিভিন্ন মসজিদ-মন্দিরে প্রার্থনায় তাঁর নাম উচ্চারিত হয় আজও। মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর পরকালীন জীবন শান্তিময় করুণ। এমন কীর্তিমানের সত্যিই মৃত্যু নেই।
শুধু আফসোস, তাঁর নিজ এলাকা সিলেটে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বড় কোনো স্থাপনার নামকরণ হয়নি আজ পর্যন্ত। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্য।
তবে আমি আশাবাদী, কোনো একদিন হয়তো তাঁর নামে বড় কোনো স্থাপনা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল হবে, নিশ্চয়ই বর্তমান প্রজন্ম তাঁকে একদিন আরও সম্মান জানাবে…
লেখক- রুমেল এম এস পীর, সহযোগী অধ্যাপক সিএসই, ও বিভাগীয় প্রধান ইইই, লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট।












