মাওলানা মাহবুবুর রহমান নোমানি::
মাওলানা রইছ উদ্দিন সাহেব কালারুকী রাহঃ ছিলেন আমাদের ছাতকের গৌরব। তিনি ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের একজন বিখ্যাত ওয়াইয । ওয়ায মাহফিলে মসজিদ-মাদরাসার জন্য চাঁদা উত্তোলনে তিনি ছিলেন বেশ কৃতিত্বের অধিকারী । কেউ চাঁদা দিলেই তিনি ছন্দের মাধ্যমে তাঁর জন্য দু’আ করতেন । প্রত্যেকের জন্য তিনি তাৎক্ষনিক নতুন নতুন ছন্দ বানাতে পারতেন। এজন্য শ্রোতারা আকৃষ্ট হয়ে আরো বেশী বেশী দিতে থাকতেন । তিনি ছিলেন এক স্বভাবগত কবি । কালারুকী সাহেব মাহফিলে আসলেই শ্রোতাদের মাঝে এক ধরনের কৌতুহল অনুভব করা যেতো । তিনি সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ওয়াজ করতেন, আঞ্চলিক ভাষাতেই ছন্দ রচনা করতেন এবং সুর দিয়ে পড়তেন । ছন্দ রচনা ও সুর প্রয়োগে তাঁর স্টাইল ছিলো একান্তই নিজস্ব; এতে কোন কৃত্রিমতা ছিল না । কেউ কেউ এখন চাঁদা তুলতে তাঁর স্টাইল ফলো করলেও তাঁর সেই রস আর পাওয়া যায় না। তাই স্বভাবতঃই মনে পড়ে সেই কবিতা – –
رسم اذان رہگی ہے – روح بلالى نہ رہے
فلسفہ اب رہگی بہی- تلقین غزالى نہ رہے

এলাকার মুরব্বীদের কাছ থেকে শুনেছি, কালারুকী সাহেবের প্রাথমিক জীবন ছিলো অনেকটা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতই । দীর্ঘদিন পর হঠাৎ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় । বেশ বড় হয়ে তিনি লেখা-পড়া শুরু করেন এবং গাছবাড়ী মাদরাসা থেকে কামিল পাশ করেন । সেকালে গাছবাড়ী এলাকায় মুশাআরা অনুষ্ঠানের প্রথা ছিলো । তিনি সে সকল অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন । আমি গাছবাড়ী পড়ার সময় লজিং এলাকার অনেক প্রবীন মুরব্বী আমাকে মাওলানা রঈস উদ্দিন সাহেবের কথা জিজ্ঞাসা করতেন। এতে বুঝা যায়, সেই এলাকার জনগণের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিলো ।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত বলিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী । ১৯৮৩ সালে যখন ছাতক জালালিয়া মাদরাসায় পড়তাম, তখন একবার ছাতক বাজার চাউল হাটায় ডাঃ গোলাম মোন্তকা সাহেবের ফার্মেসীর সামনে একটি ওয়াজ মাহফিল হয়েছিল । ছাহেব কিবলা ছিলেন প্রধান মেহমান । আসর নামাযের সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে বিনা মাইকে কালারুকী সাহেবের একক তাকবীরেই সেদিন ওয়াজ মাহফিলে নামাযের জামাত পড়া হয়েছিলো । আমার বয়স ছিলো তখন এগারো বছর ।

গত শতাব্দীর ৮৪/৮৫ সালে প্রায় বৃদ্ধ বয়সে তিনি দ্বারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী থেকে খুসুসী জামাতে পড়ে ইলমে ক্বিরাতের সনদ লাভ করেন । আমাদের গ্রামের ক্বারী আব্দুল হাফিয (রাহঃ) ঐ বছর ফুলতলীতে ছিলেন । তাঁর কাছ থেকে শুনেছি, কালারুকী সাহেবের মুখের সামন দিকের দুটি দাঁত পড়ে গিয়েছিল, সামনের দাঁতের সাথে সংশ্লিষ্ট অক্ষরগুলো তিনি সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারতেন না; ছাহেব কিবলার কাছে সবক দিতে গেলে তিনি বার বার জড়োসড়ো হয়ে নিজের আঙ্গুল দিয়ে দাঁতের দিকে ইশারা করতেন । ঐ বছর দ্বারুল ক্বিরাতের যে ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় – তাতে কালারুকী সাহেবের একটি কবিতাও ছাপা হয়েছিলো , যার প্রথম দুটি লাইন আজো আমার মনে পড়ে – –

“এলাহী – – – – –
এহসানো করিও জারি- বলা করিও দুর,
সালামত রাখিও ঝান্ডা- বদরে বদর পুর এলাহী !!- – – – “

ওয়াজ মাহফিলে যে সব ছন্দ তিনি বলতেন তার কয়েকটি নমুনা দেয়া হলো-

“এক ভাইয়ে লিল্লাহ দিছইন নাম তাহার রহমত
কবরের মুরদারে তাহার করো মাগফিরত এলাহী-“

“আরেক জনে লিল্লাহ দিছইন কইয়া দাদা-দাদী,
কবরের মুরদারে রহম করো নিরবদী এলাহী-”

এভাবে অসংখ্য ছন্দ তিনি অনর্গল বলে যেতে থাকতেন । ছন্দ শুনার জন্য ছোট্ট শিশুরাও তাঁর মাহফিলে টাকা দিতো ।

আমার শিক্ষক জনাব শাফিউর রহমান ভাদেশ্বরী (রাহিঃ) বলেন, তিনি কৈলাশ থেকে ফুলবাড়ি চলে আসার পর একদিন কালারুকী সাহেবকে পেয়ে ফূর্তি করে বললেন, আপনি তো শুধু চাঁদা তোলার ছন্দ জানেন- দেখি, আমাকে নিয়ে একটি ছন্দ বলেন তো!
সাথে সাথেই তিনি নিজস্ব স্টাইলে সুর করে বলে উঠলেন-

“মাওলানা শাফিউর রহমা-নে আমরারে
করিলা নৈরা–শ,
ফু-ল বাড়ী চলি গেলা, ছাড়ি-লা কৈলাশ এলাহী-“
ডাদেশ্বরী জনাব বলেন, এই দিন আমি বুঝলাম যে, বেচারা আসলেই একজন স্বভাব কবি ।

তিনি সমাজের কল্যাণে অনেক অবদান রেখে গেছেন । কালারুকা লতিফিয়া দাখিল মাদরাসা তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন ।

এই প্রতিভাবান আলেমে দ্বীন বিগত ২০০৬ সালের শেষ দিকে ইন্তেকাল করেন । যতদুর মনে পড়ে ডিসেম্বর মাস ছিল । নির্বাচনী সফরের পথে আমি তাঁর জানাযায় অংশ নিয়েছিলাম । কালের চক্রে কত গুণী মানুষ এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছেন । যারাই চলে যান তাদের শূন্যস্থান আর পুরন হতে দেখা যায় না । দু’আ করি আল্লাহ তা’য়ালা যেন তাঁর সমস্ত দ্বীনী খিদমাত কবুল করে নেন এবং তাঁকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকামে আসীন করেন। আমীন!!
লেখক, মাওলানা মাহবুবুর রহমান নোমানি
মুফতি, শাহ জালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা পাঠানটুলা সিলেট।