সিলেটউইটনেস ডেস্কঃ সিলেটের আখালিয়া এলাকার যুবক রায়হান আহমদ (৩৩) নিহতের পর থেকেই আলোচনায় নগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি। এই ফাঁড়িতেই নির্যাতন চালিয়ে রায়হান আহমদকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠেছে।

১১ অক্টোবরের ওই ঘটনার পর থেকেই রায়হান হত্যার বিচার দাবিতে প্রতিদিন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সমানে বিক্ষোভ করছেন অসংখ্য মানুষ। ফাঁড়ি ঘেরাও করেও বিক্ষোভ করছেন অনেকে। বন্দর বাজার ফাঁড়ির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এ অবস্থায় এই ফাঁড়ির নিরাপত্তায় সিলেট মহানগর পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট ‘ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি) কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে বন্দরবাজার ফাঁড়ির সামনে সিআরটি সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। সিআরটি সদস্যদের উপস্থিতিতেই রায়হান হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন অনেকে।

সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম মিঞা বলেন, রায়হানের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সামনে অনেকে প্রতিবাদ করছেন। এসব কর্মসূচী থেকে যাতে কোনো অনাকাঙ্খিত ঞটনা না ঘটে এ জন্য ফাঁড়ির নিরাপত্তায় সিআরটি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

এরআগে বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর আখালিয়ায় রায়হান হত্যার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ কর্মসূচীতে পুলিশের উপর আক্রমণের ঘটনা ঘটে। ওই কর্মসূচী চলাকালে পুলিশ সদস্যদের ধাওয়া করে উপস্থিত জনতা।

অতিরিক্ত আঘাতে রায়হানের মৃত্যু: ফরেনসিক বিভাগ

শরীরে অতিরিক্ত আঘাতের কারণেই রায়হান আহমদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টেবার) রায়হানের দ্বিতীয় ময়না তদন্ত শেষে তিনি সাংবাদিকদের এমনটি বলেন।

ডা. শামসুল ইসলাম বলেন, রায়হানের শরীরে অনেকগুলো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাকে প্রচন্ড মারধর করা হয়েছে। এসব কারণেই তার মৃত্যু হতে পারে। তবে ময়না তদন্তের রিপোর্ট এলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা যাবে।

এদিকে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত শেষে আবারও তার মরদেহ দাফন করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে মরদেহ দাফন করা হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সজিব আহমেদ, মেজবাহ উদ্দিন, পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলাম, স্থানীয় কাউন্সিলর মখলেছুর রহমান কামরানের উপস্থিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর একটি দল আখালিয়া এলাকার নবাবী মসজিদের পঞ্চায়েতি গোরস্থান থেকে রায়হানের মরদেহ উত্তোলন করে।

এরপর ময়না তদন্তের জন্য মরদেহ নিয়ে আসা হয় ওসমানী হাসপাতালের মর্গে। রায়হানের দ্বিতীয়বার ময়না তদন্তের জন্য তিন সদস্যে একটি বোর্ড গঠন করা হয়। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান, ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. শামসুল ইসলামকে প্রধান করে এ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়।

বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন- প্রভাষক ডা. দেবেস পোদ্দার, প্রভাষক ডা. আবদুল্লাহ আল হেলাল।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেট জেলা পুলিশ সুপার খালেকুজ্জামান বলেন, জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে রায়হানের মরদেহ তোলা হয়েছে। মরদেহ তোলার পর সুরতহাল করা হয়। এরপর ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত শেষে পুণরায় তার দাফন করা হয়।

উল্লেখ্য, গত ১১ অক্টোবর (রোববার) ভোরে রায়হান আহমদ (৩৩) নামে সিলেট নগরের আখালিয়ার এক যুবক নিহত হন। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে প্রচার করা হয়, ছিনতাইয়ের দায়ে নগরের কাষ্টঘর এলাকায় গণপিটুনিতে নিহত হন রায়হান। তবে বিকেলে পরিবারের বক্তব্য পাওয়ার পর ঘটনা মোড় নিতে থাকে অন্যদিনে। পরিবার দাবি করে, সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দর বাজার ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনে প্রাণ হারান রায়হান।

ওই রাতেই পুলিশকে অভিযুক্ত করে সিলেটের কোতোয়ালি থানায় হেফাজতে মৃত্যু আইনে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি। পরদিন রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) শাহরিয়ার আল মামুনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সিলেট মহানগর পুলিশ।

তদন্তে নেমে পুলিশ হেফাজতে রায়হান উদ্দিনের মৃত্যু ও নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতাও পায় তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটি জানতে পারে রোববার ভোর ৩টার দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সুস্থ অবস্থায় রায়হান আহমদকে আনা হয় বন্দরবাজার ফাঁড়িতে। সেখানে ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বেই তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রায়হানকে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকাল ৭টার দিকে মারা যান তিনি।

রায়হান নগরের আখালিয়ার নেহারিপাড়া এলাকার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকায় এক চিকিৎসকের চেম্বারে সহকারি হিসেবে কাজ করতেন।