শিক্ষা ডেস্কঃ
২০১৯ সালে এ পর্যন্ত মোট ৬ টি ক্যাটাগরিতে সর্বমোট ১৫ জন নোবেল পেয়েছেন । তবে সবাইকে ছাপিয়ে আমার মূল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু পদার্থবিজ্ঞানের তিনজন নোবেলবিজয়ীর অন্যতম কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত প্রফেসর জেমস পিয়েবলস(James Peebles)। এর কারণ আমি রসায়নের ছাত্র হলেও বেশ কিছুদিন ধরে Bigbang,Cosmic Microwave Background Radiation(CMB) ও Observable Universe নিয়ে সামান্য পড়াশুনা করছিলাম।ভালো লাগার বিষয় হল এবার পদার্থবিদ্যায় যে তিনজন নোবেল জিতেছেন তাদের মধ্যে জেমস পিয়েবলস মহাবিশ্বের গঠনকাঠামো,আচরণ এবং শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত তার বিবর্তন নিয়ে গবেষণার জন্য একাই নোবেল প্রাইজ এর সমুদয় অর্থের অর্ধেক শেয়ার করছেন । বাকি দুজন বিজয়ী সূর্য সদৃশ নক্ষত্রের চারপাশে ঘূর্ণায়মান গ্রহ আবিষ্কারের জন্য যৌথভাবে অবশিষ্টাংশ শেয়ার করবেন।সেটা নিয়ে অন্যদিন আলোচনা করার ইচ্ছে আছে।

জেমস পিয়েবলস মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কর্মস্থল প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর এমিরিটাস । তাছাড়া তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আলবার্ট আইনস্টাইন প্রফেসর ইন সায়েন্স পদ অলংকৃত করে আছেন । ক্যারিয়ারের এমন একটা সময়ে সর্বশ্রেষ্ঠ এ সম্মানে ভূষিত হলেন যখন তিনি ৮৪ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ,শ্রবণশক্তি প্রায় লোপ পেয়েছে,কথা বলতে বলতে প্রসঙ্গ ভুলে যান । তবুও তার তারুণ্য সবাইকে মুগ্ধ করে।এখনো ক্লাসে কিংবা সংবাদ সম্মেলনে স্বভাবসুলভ রসিকতা করে যান । 
অথচ তার এ অর্জনের ইতিহাসের পেছনে আছে দীর্ঘ ৫০ বছরের সাধনা ও শ্রম । শুরুতে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়েই কাজ করতেন ও পড়াতেন। পরে কি মনে করে কসমোলজি নিয়ে কাজ করা শুরু করলেন এবং তার হাত ধরেই তখনকার সময়ের অবহেলিত ও অজনপ্রিয় এই বিষয়টি ধীরে ধীরে Modern Physical Cosmology নামে প্রতিষ্ঠিত হয় ।

যে কারণে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন : যারা কমবেশি বিজ্ঞানের খোঁজ রাখেন,তাদের হয়তো মনে আছে ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে বেল ল্যাবে বিজ্ঞানি আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ স্থাপনের জন্য বেতার তরঙ্গ নিয়ে কাজ করছিলেন । এজন্য তারা ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি supersensitive হর্ন এন্টেনা ব্যবহার করছিলেন যা অত্যন্ত সুক্ষ্ণভাবে বেতার কিংবা মাইক্রোওয়েভ সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম ।
পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে তারা ডিটেক্টরে এক অদ্ভুত সংকেত লক্ষ্য করেন যা তাদের কাঙ্ক্ষিত বেতার সংকেতের চেয়ে বেশি তীব্রতাসম্পন্ন । তারা এটাকে স্রেফ বায়ুমন্ডলের নয়েজ মনে করে এন্টেনা ঘুরিয়ে ধরলেন । অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন যেদিকেই এন্টেনা ঘুরানো হোক না কেন সংকেতটি কিছুতেই তাদের পিছু ছাড়ছে না । পরে তারা রাডার,বেতারযন্ত্রসহ নয়েজ সৃষ্টিকারী সব ধরনের টুলস সরিয়ে রাখলেন । এমনকি এন্টেনা পরিষ্কার করতে গিয়ে পাওয়া পুরনো কবুতরের বাসা সরিয়েও ঐ ভুতুড়ে সংকেত দূর করতে পারছিলেন না ।
সবশেষে নিরুপায় হয়ে সে সংকেত পর্যালোচনা করতে বসলেন। নিশ্চিত হলেন এটি একটি দূর্বল মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ যা এই পৃথিবী,সূর্য বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে সৃষ্ট নয় ।আমাদের গ্যালাক্সির বাইরের জগৎ থেকে এ সংকেত বর্তমানে আকাশের সর্বত্র দিবারাত্রি সমভাবে ছড়িয়ে আছে । তাই এন্টেনা যেদিকেই তাক করে না কেন এই ভুতুড়ে সংকেত থেকে তারা রেহাই পাচ্ছিলেন না ।

একইসময়ে তাদের থেকে মাত্র ৩৮ মাইল দূরে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বব ডিকি এর নেতৃত্বে একদল গবেষক উত্তপ্ত মহাবিশ্ব বা বিগব্যাং নিয়ে গবেষণা করছিলেন । এ গবেষণায় বব ডিকির অন্যতম সহযোগী ছিলেন তরুন গবেষক জেমস পিয়েবলস । তিনি একটি গবেষণাপত্র লিখেন যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যদি বিগব্যাং তত্ত্ব সত্যি হয়ে থাকে তাহলে তার প্রমানস্বরূপ এতোদিনে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের Redshift মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন ধরা পরার কথা । এই রেডিয়েশন এর নাম দেয়া হয় Cosmic Microwave Background Radiation সংক্ষেপে CMB বলে । এই CMB এর ভেতরেই নিহিত আছে মহাবিশ্বের সৃষ্টি,আচরণ,বিবর্তন ও পরিণতি।

এ ব্যপারে আরেকটু ক্লিয়ার করা যাক।আমরা সবাই জানি ডাইনোসর আজ থেকে ৬ কোটি বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয় । কিন্তু তখনো পৃথিবীতে মানুষের আগমন ঘটেনি । তারপরও এখন আমরা জানি পৃথিবীতে একসময় ডাইনোসর নামে একধরনের প্রাণী দাপিয়ে বেড়াতো এবং কোন এক প্রাকৃতিক কারনে তারা বিলুপ্ত হতে হয় । এর জন্য কিন্তু আমাদের টাইম ট্রাভেল করে অতীতে গিয়ে ডাইনোসর দেখে তাদের অস্তিত্ব প্রমান করতে হয় নি । আমরা জেনেছি পাললিক শিলাস্তরে পাওয়া ডাইনোসর এর ফসিল থেকে যা তাদের অস্তিত্বকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে।
ঠিক তেমনি বিগব্যাং যার ফলে মহাবিশ্বের সৃষ্টি আমরা তা কখনো দেখি নি এবং দেখা সম্ভব ও না । তবে তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তার একটি ফসিল পাওয়ার কথা যা ১৩৭০ কোটি বছর আগের ঘটে যাওয়া বিগব্যাং এর অস্তিত্বের স্বাক্ষ্য বহন করবে ।

সবার বুঝার সুবিধার্থে আরেকটু বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য এখন বিগব্যাং পর্যন্ত যেতে হবে।
আজ থেকে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে বিগব্যাং এর পর পরই কিন্তু কোন কণা বা প্রতিকণার অস্তিত্ব ছিলো না । তখন কনা,প্রতিকনা,রেডিয়েশন সবকিছু একাকার হয়ে অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমা অবস্থায় ছিলো । যা কল্পনা করলে অনেকটা স্যুপের মত । তখন তাপমাত্রা এতো বেশি ছিলো যে তখনো কোন ধরনের পরমাণু বা অনুর সৃষ্টি হয় নি । পুরো মহাবিশ্ব তখন ছিলো অস্পষ্ট ও অসচ্ছ অর্থাৎ আলোর ফোটন কনাগুলো সেই প্লাজমা স্যুপ এর মধ্যে আটকে ছিলো । মূলত ৩৮০০০০ বছর পরের সময়ে এসে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে আসে এবং রিকম্বিনেশন এর মাধ্যমে পরমাণু ও গ্যাসীয় অণুর সৃষ্টি করে । এর ফলে সেই অস্বচ্ছ কুয়াশা কেটে যায় এবং ফোটন কণাগুলো বন্দিদশা থেকে মুক্তি পায়। 
অবশেষে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর ভ্রমণ করে বর্তমানে আমাদের কাছে এসে পৌছেছে।অপরদিকে বিজ্ঞানী এডুইন হাবলের আবিষ্কৃত হাবল টেলিস্কোপের কল্যাণে আমরা জানতে পারি মহাবিশ্ব শুরু থেকে এখনো সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে । এই সম্প্রসারণ যেহেতু স্থানকাল মধ্যে ঘটছে সুতরাং তা আলোর ফোটন কণাগুলোকেও Stretch করে চলেছে । ফলে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায় এবং পাশাপাশি ফোটন কণাগুলোর শক্তি কমতে থাকে।আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেড়ে যাওয়ার এ ঘটনাকেই রেডশিফট বলে যা এতোদিনে মাইক্রোওয়েভে পরিণত হয়েছে । অপরদিকে শক্তি কমে যাওয়ার অর্থ হল তার তাপমাত্রা কমে যাওয়া । বব ডিকি ও জেমস পিয়েবলস সেই তাপমাত্রা গণনা করে দেখেন এতোদিনে এর তাপমাত্রা কেলভিন এর সামান্য কম বেশি তাপমাত্রায় পৌছানোর কথা । অর্থাৎ ২.৭ কেলভিন তাপমাত্রার এই তরঙ্গই Cosmic Microwave Background Radiation বা CMB যা বিগব্যাং এর ফসিল ! বেল ল্যাবের সেই বিশালাকৃতির হর্ন এন্টেনায় ধরা পরা সেই ভুতুড়ে সংকেতটি আসলে CMB বা বিগব্যাং এর ফসিল ছিলো ।

এই ফসিলকেই খুঁজে বের করার জন্য বব ডিকি ও তার দল একটি রেডিওমিটার আবিষ্কার করেছিলেন । কিন্তু প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে বসানো সেই যন্ত্রে সেই ফসিল কিছুতেই ধরা দিচ্ছিলো না । অথচ তার সামান্য কয়েক মাইক দূরে বেল ল্যাবেই কিনা পেনজিয়াস ও উইলসন দূর্ঘটনা বশত সেই ফসিল আবিষ্কার করে বসলেন ! যাহোক তখনো তারা জানতেন না এ সংকেত কোথা থেকে এসেছিলো । পরে এক বন্ধু মারফত জানতে পারেন এমন এক সংকেত নিয়ে জেমস পিয়েবলস ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন । কাজেই তারা ডিকি ও পিয়েবলস এর কাছে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে সংকেতটির ব্যপারে বিস্তারিত জানতে চান । তাদের পরামর্শ অনুসারে সংকেতটির তাপমাত্রা বের করে দেখলেন এই সেই তাপমাত্রা যা পিয়েবলস ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন । পরে উভয় গ্রুপ দুটি আলাদা পাবলিকেশন প্রকাশ করে। এ আবিষ্কার এর জন্য ১৯৭৮ সালে পেনজিয়াস ও উইলসন নোবেল পুরস্কার লাভ করেন । কিন্তু আক্ষেপের বিষয় যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে এর ভবিষ্যদ্বাণী করলেন তাদের কেউ নোবেল পেলেন না ।
সেই আক্ষেপের অবসান হয় ২০১৯ সালে জেমস পিয়েবলস এর নোবেল বিজয়ের মধ্য দিয়ে। উল্লেখ্য CMB সম্পর্কে তাদের আগে জর্জ গেমো ও আলফার একটি গবেষণাপত্রে সর্বপ্রথম ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ।

এই Cosmic Microwave Background আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার পরিধি বিস্তৃত করে ।
এর মাধ্যমেই জানা সম্ভব হয়-
* বিগব্যাং এর ৩৮০০০০ বছর পর মহাবিশ্ব কতোটা উত্তপ্ত ছিলো ।
* কিভাবে পরমাণু ও অণুগুলো রিকম্বিনেশন করে ।
* মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের জন্য দায়ী Dark Enargy, গ্যালাক্সি ও ক্লাস্টারগুলোর অতিরিক্ত মহাকর্ষীয় বলের জন্য দায়ী Dark Energy সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে ।
* নক্ষত্র,গ্যালাক্সি ও ক্লাস্টার কিভাবে গঠিত হয় ।
* আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ব্যাসার্ধ কত ইত্যাদি ইত্যাদি ।
এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার মধ্য দিয়েই Physical Cosmology বিষয়টি পরিপূর্ণতা লাভ করে ।

১৯৬৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে কঠোর শ্রম ও সাধনা দিয়ে যিনি মহাবিশ্বকে ভালোভাবে বুঝার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন । শুধু তাই নয় তিনিই বলে গেছেন মহাবিশ্বের মাত্র ৫% দৃশ্যমান বস্তু দ্বারা গঠিত যা সম্পর্কে আমরা ধারণা রাখি ; বাকি ৬৮% Dark Energy ও ২৭% Dark Matter যা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।এর অর্থ হল এখন পর্যন্ত মহাবিশ্বের ৯৫% পরিমাণ আমাদের কাছে কেবলই রহস্য যতদিন না পর্যন্ত Dark Matter ও Dark Energy এর রহস্য বের না করতে পারছি! এমন সবকিছু জানার ক্ষেত্রে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনিই হলেন জিম পিয়েবলস । আর তার এই অসামান্য অবদানের জন্যই এ বছর তার হাতে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেখেছি। 
Royal Swedes Academy of Science এর নোবেল ঘোষনার পর সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন মূলত নির্দিষ্টভাবে কোন তত্ত্বের জন্য তাকে নোবেল দেয়া হয়,তিনি এর প্রতি উত্তরে বলেন “It’s my life’s work.”

তিনি তার এই অর্জনের পিছনে অন্যদের বিশেষ করে রুশ বিজ্ঞানীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন । এটা তার উদারতার বড় পরিচয়। 
তার নোবেল প্রাপ্তি উদযাপন উপলক্ষে গত ৯ অক্টোবর তার কর্মস্থল প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করা হয় । সেখানে এক দর্শক তরুণদের জন্য তার পরামর্শ কী জানতে চেয়ে প্রশ্ন করলে, তিনি তার জবাবে বলেন, “My advice is not to aim for prizes and awards. They will come or they won’t. Don’t judge your career by their number, by the count of prizes. We’re in this for the joy of research, the fascination, the love of science. That is the reward really…”

এমন গুণী বিজ্ঞানীর কাছ থেকে এর চেয়ে সুন্দর উত্তর কী আর হতে পারে ! সৃষ্টিকর্তার কাছে আকুল আবেদন তিনি যেন আরো দীর্ঘায়ু লাভ করেন ।

লেখকঃসাইফুল ইসলাম,প্রভাষক, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ।