সিলেটউইটনেস ডেস্কঃ শাহাব উদ্দিন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বাসদ নেতা এবং এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের তুখোড় ছাত্রনেতা। তিনি নিউইয়র্কের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। টানা ১১ দিন হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত (কোভিড-১৯) হওয়া এবং মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে ফেরার দিনগুলির গল্প লেখনীতে হুবহু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
‘করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির মধ্যে বেশি মারা গেছে নিউইয়র্কে। সেই নিউইয়র্কে মৃত্যুর দূয়ার থেকে ফিরেছি আমি। টানা ১১ দিন হাসপাতালে থেকে কোভিড-১৯ এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। আমি বাসায় ইতোমধ্যে ১৫ দিনের কোয়েরেন্টাইনও শেষ করেছি। আমি মনে করি, আমার বাসায় ফাস্ট ফ্লুরের ভাড়াটিয়ার একটি জ্যাকট থেকে হয়তো ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে।
চারদিকে যখন করোনার ভাইরাস নিয়ে মাতামাতি তখন অর্থাৎ ১ মার্চ কাজ বন্ধ করে দিই। কিন্তু মাঝে-মধ্যে আমি বিভিন্ন সুপার মার্কেট ও গ্রোসারী শপে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য যেতাম। একদিন দেখি আমার ফাস্ট ফ্লুরের ভাড়াটিয়া করিডোরে একটি জ্যাকেট টাঙ্গিয়ে রেখেছেন। এটি দেখে আমার মনে একটু সন্দেহ জাগলো। তারপরও মনে কিছু নিইনি। ১২ মার্চের দিকে আমার একটু শরীর খারাপ লাগা শুরু হলো। এর পর দেখি জ্বর আর ঠান্ডা কাশি। মনে করেছিলাম এই সময়েতো ঠান্ডা লাগে এরকম কিছু হয়েছে। কিন্তু জ্বর না কমার কারণে আমার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মতিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করি।
তিনি আমার সব শুনে আমাকে ১০ দিনের এন্টিবায়েটিকসহ কিছু ওষুধ দিলেন। আমি এর পর চলে গেলাম কোয়েরাইন্টাইনে। কিন্তু ২৪ র্মাচ পর্যন্ত আমার জ্বর আর কাশি কোনভাবেই না কমায় আবারও ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তিনি আমাকে সেকেন্ডে ড্রোজ দিলেন বললেন- যদি বেশি সমস্যা হয় হাসপাতালে চলে যেতে।
এরমধ্যে নিউইয়র্কে লকডাউন শুরু হলো। ২৫ ও ২৬ মার্চের দিকে এলমাহার্স্ট হাসাপতাল মৃত্যুর মিছিল বাড়তে থাকে। মারা যাচ্ছেন বহু বাংলাদেশিও। ২৭ মার্চ রাতে আমার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। মনে হচ্ছে প্রাণ যায় যায়। সকালে উঠে সিদ্ধান্ত নিলাম হাসপাতালে যাওয়ার। ভাবলাম এখন এম্ব্যুলেন্স কল দিলে তারা আমাকে নিকটস্থ হাসপাতাল মাউন্স সিনাই বা এলমাহাস্টে নিয়ে যাবে, কিন্তু আমি ওখানে যেতে চাচ্ছি না।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার শ্বাসকষ্ট আরো বাড়তে থাকলো। আমি এম্ব্যুলেন্স কল করি। কিন্তু তারা আমার কন্ডিশেন জেনে ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসবে বলে জানান। পরে সিদ্ধান্ত নিই, আমি ম্যানহাটানের কর্ণেল হাসপাতালে যাবো। আমার ছেলে আমাকে গাড়িতে করে কর্ণেল হাসপাতালে নিয়ে যায় ২৮ মার্চ দুপুর ১২ টার দিকে।
জরুরী বিভাগে যাওয়ার পর আমার সব ধরণের পরীক্ষা শুরু হয় এবং তারা একটি আলাদা রুমে নিয়ে যায়। একটু পর ডাক্তার এসে আমাকে বলেন, “করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে আমার ‘লাঞ্চ মাল্টিপল ডেমেজ”।
তবে ডাক্তাররা বলেন, ভয়ের কিছু নেই আমরা চিকিৎসা শুরু করছি। এর কিছুক্ষণ পর আমাকে অক্সিজেন দেয়া শুরু হলো। সেই অক্সিজেনেই ছিলাম ১০ দিন।
২৯ মার্চ ডাক্তাররা এসে আমাকে বলে আমার রির্পোট এসেছে কোভিড-১৯ পজেটিভ। কিন্তু মাঝখানে আমার ডায়েবেটিস ৪৫০ হয়ে গেছে। আমি এ দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। ডাক্তারা আমার ডায়বেটিস কন্টোল করতে হিমশিম খেতে শুরু করেছেন। আমার ভয় বাড়তে থাকে। তাঁরা আমাকে বলেন, কোভিড-১৯ এমন একটা রোগ আগে থাকা সব রোগ বা উপশমগুলোকে বাড়িয়ে দেয়। ডাক্তার আমার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ইনজেকশন দিতে থাকেন। তারা আমাকে বেশি করে সবজি ও ফ্রুটস সরবরাহ করেন।
সত্যিকি ওই সময়ে নার্স বা ডাক্তারা যেভাবে সেবা দিচ্ছিলেন, তখন তাদের মনে হয়েছে একেকজন দেবদূত। আমি তাদের পরামর্শে আস্তে আস্তে খাওয়া শুরু করি। হাসপাতালে থাকার সময় একটি ঘটনা আমার মনে পড়েছে। ভর্তির তৃতীয় রাত, অক্সিজেন চলছে। রুমে একাই শুয়ে আছি। রাত ৩ টার দিকে ঘুম আসে। দেখি দরজা জানালা ভেঙ্গে ঝড় আসছে। ঝড়ের গতি এমন যে সবকিছু চুরমার করে ফেলবে। ঝড়ের সঙ্গে একটি কালো বিশাল বাজপাখি। পাখিটি আমার হাতের ডানপাশে বসার চেষ্টা করছে। একটু পরেই ঘরের দরজা-জানালা ভেঙ্গে যাবে ঝড়ে। প্রচন্ড ভয় হচেছ কিন্তু ঝড়টি আমার কাছে আসার আগেই আমার মা ( যিনি কি না কবরে শুয়ে আছেন) এসে বলে তুই একটু ওদিকে যা আমি তোর পাশে শুবো।
এ কথা বলার পর পর ঝড় আমার দিকে আসতে পারলো না, বাজ পাখিটিও কোথায় গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভাঙ্গার পর নিজের শরীরে চিমটি কেটে দেখি আমি কি স্বপ্নে ছিলাম না কি অন্য কিছুতে। এ দৃশ্য আমি কোন দিন ভুলতে পারবো না।
আমি কর্ণেল হাসপাতালে ১০ দিনি চিকিৎসা নেওয়ার পর ডাক্তারা আমার অক্সিজেন খুলে দেয় এবং ২৪ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখার পর বাসায় পাটিয়ে দেয়। হাসপাতাল থেকে আসার পরও আমি ১৫ দিনের কোয়েরাইন্টান শেষ করেছি। এখনও শরীর দুর্বল। তবে মুখে রুচি এসেছে। আমি একটু একটু করে সব খেতে পারছি, হাটতে পারছি, নামাজ পড়তে পারছি। আমার অসুস্থ হওয়ার পর ধর্ম-বর্ণ নির্বেশেষ যারা প্রার্থনা করেছেন তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা তাদের প্রার্থনায় আমাকে আবারও আপনাদের মাঝে ফিরিয়ে এনেছেন। আমি শোকরিয়া আদায় করছি আল্লাহর কাছে যার দয়ায় আমি মৃত্যুর দূয়ার থেকে ফিরে এসেছি।’














